সোমবার, ৭ এপ্রিল, ২০১৪

গণতন্ত্র ও প্রশ্নোত্তর


গণতন্ত্র সম্পর্কে কয়েকটি প্রশ্নোত্তর
-- লিখেছেন লুৎফুর রহমান ফরায়েজী, সহকারী মুফতী-জামিয়াতুল আস’আদ আল ইসলামিয়া-ঢাকা

ক. গনতন্ত্র কি?
খ. গনতন্ত্র সম্পর্কে শরীয়তের বিধান কি?
গ. যারা গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করে তাদের ব্যাপারে ইসলাম কি বলে?
ঘ. গনতন্ত্রের মাধ্যমে কি ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব?
ঙ. গনতন্ত্র এবং শুরা কি একই? পার্থক্য থাকলে তা কি?

জবাব:

بسم الله الرحمن الرحيم

ক-গণতন্ত্র কি?

গণতন্ত্র শব্দটি গ্রীক শব্দ। democracy (ডেমোক্রেসি) এর অনুবাদ। পরিভাষায় গণতন্ত্র বলা হয়-জনসাধারণের প্রতিনিধি দ্বারা সাম্যের নীতি অনুসারে রাষ্ট্রশাসন করা। গণনতান্ত্রিক সরকার বলা হয় কোন শ্রেণী, গোষ্ঠী বা ব্যক্তিবিশেষ কর্তৃক শাসনের পরিবর্তে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের নিয়ন্ত্রণাধীন পরিচালিত সরকারকে।

খৃষ্টপূর্ব ৫০ ও ৪র্থ শতকে গ্রীক নগর রাষ্ট্রগুলোতে সর্বপ্রথম গণতন্ত্রের উন্মেষ ঘটে। রোমান প্রজাতন্ত্রে জন প্রতিনিধিত্ব নীতির উদ্ভব হয়। শাসিত ও শাসকের মধ্যে চুক্তি বিদ্যমান থাকার নীতি মধ্যযুগে উদ্ভুত। পিউরিট্যান বিপ্লব, মার্কিন স্বাধীনতা ও ফরাসী বিপ্লবের প্রভাবে আধুনিক গণতন্ত্রের প্রসার ঘটে। জন লক, জে জে রূশো, ও টমাশ জেফারসন গণতন্ত্রবাদের প্রভাবশালী তাত্ত্বিক ছিলেন। প্রথমে রাজনৈতিক ও পরে আইন সম্পর্কীয় সমান অধিকারের দাবী উত্থাপনের ফলে গণতন্ত্র বর্ধিত হয়। পরবর্তীকালে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাম্যের দাবিও গণতন্ত্র সম্প্রসারণের সহায়ক হয়। প্রতিযোগিতাশীল রাজনৈতিক দলসমূহের অস্তিত্বের উপর আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিশেষভাবে নির্ভরশীল। কারণ প্রচালিত গণতন্ত্রে জনগণ কর্তৃক প্রতিনিধি নির্ধারণের জন্য নির্বাচন আবশ্যক, আর নির্বাচনের জন্য প্রতিযোগিতাশীল রাজনৈতিক দলসমূহের অস্তিত্ব আবশ্যক। গণতান্ত্রিকগণ মনে করেন একমাত্র রাজনৈতিক গণতন্ত্রের মাধ্যমেই জনগণের সুযোগ সুবিধার সাম্য রক্ষা সম্ভব। পক্ষান্তরে সমাজতান্ত্রিকদের অভিমত হল অর্থনৈতিক গণতন্ত্রই একমাত্র ভিত্তি। যার উপর সত্যিকার রাজনৈতিক গণতন্ত্রের সৌধ নির্মাণ করা যেতে পারে।

ইসলামে রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচন পদ্ধতিঃ(ইসলামের সাথে গণতন্ত্রের পার্থক্য বুঝতে সহায়ক হবে)

ইসলামে রাজ্য শাসন পদ্ধতি কি হবে তা নির্দিষ্ট। তা হল কুরআন-সুন্নাহর ভিত্তিতে রাজ্য পরিচালনা পদ্ধতি তথা ইসলামী খিলাফত পদ্ধতি। তবে সরকার প্রধান নির্বাচনের পদ্ধতির ক্ষেত্রে বাহ্যতঃ ইসলামে কয়েকটি পদ্ধতি পরিদৃষ্ট হয়। যথা-

১-পূর্ববর্তী খলীফা কর্তৃক পরবর্তী খলীফার মনোনয়ন। যেমন হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাঃ তার পরবর্তী খলীফা হিসেবে হযরত ওমর রাঃ কে মনোনীত করে যান। উম্মতের সর্বসম্মত মতে এটা জায়েজ। তবে হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাঃ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে পরামর্শক্রমে এটা করেছিলেন।
এক্ষেত্রে মনোনয়নকৃত পরবর্তী খলীফা যদি মনোনয়নদানকারী খলীফার পুত্র হন, তাহলে প্রচলিত রাজতন্ত্রের সংজ্ঞা অনুযায়ী সেটা রাজতন্ত্র আখ্যায়িত হবে, কেননা সেটা বংশানুক্রমিক রাষ্ট্রপ্রদান শাসিত রাষ্ট্র বলে ধর্তব্য হয়। তবে অধিকাংশ ওলামায়ে কিরামের মতে ইসলামে এর অবকাশ আছে। অবশ্য কেউ কেউ বলেছেন-এটা যথাযথ কর্তৃপক্ষের সাথে পরামর্শক্রমে হতে হবে। যেমন হযরত মুয়াবিয়া রাঃ তার পুত্র ইয়াযীদকে পরামর্শক্রমে মনোনয়ন দিয়ে যান। আর সাহাবাগণ কর্তৃক এই মনোনয়নের বিরোধিতা করা হয়নি। এতে এ পদ্ধতির ব্যাপারে সাহাবায়ে কিরামরে মৌন ইজমা [ঐক্যমত্য] প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। হযরত আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের ও হযরত হুসাইন রাঃ ইয়াযীদের বিরোধিতা এ কারণে করেন নি যে, ইয়াযিদ এই পদ্ধতিতে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁরা কখনো একথা বলেন নি যে, ইয়াযীদের মনোনয়ন শুদ্ধ নয়। বরং তারা বিরোধিতা করেছেন অন্য কারণে।

২-খলীফা তার পরবর্তী খলীফা নির্বাচনের জন্য বিশেষ জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি বোর্ড গঠন করে দিয়ে যেতে পারেন, যেমন হযরত ওমর রাঃ তাঁর পরবর্তী খলীফা নির্বাচনের জন্য ছয় সদস্য বিশিষ্ট একটি বোর্ড গঠন করে দিয়ে যান।

৩-খলীফা তাঁর পরবর্তী খলীফা নির্বাচনের রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের বিষয়টি জনগণের উপর ছেড়ে দিয়ে যাবেন। তারপর জনগণই তাদের খলীফা নির্বাচিত করবে। যেমন হযরত উসমান রাঃ তাঁর পরবর্তী খলীফা নির্বাচনের বিষয়টি পরবর্তীদের উপর ছেড়ে দিয়ে যান। পরে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের পরামর্শক্রমে হযরত আলী রাঃ কে খলীফা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।

গণতন্ত্র ও ইসলামী খেলাফতের মৌলিক পার্থক্য

১-গণতন্ত্র পদ্ধতিতে রাষ্ট্র পরিচালনা মানে হল-মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা করা। আর খেলাফতের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা মানে হল আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা করা।
২-গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা মানে হল মানুষের সৃষ্ট মতবাদ প্রতিষ্ঠা। আর খেলাফত প্রতিষ্ঠা মানে হল আল্লাহর নির্ধারিত মতবাদ প্রতিষ্ঠা।
৩-গণতন্ত্রের মূল থিউরী হল মানুষকে সন্তুষ্ট করা যেভাবেই হোক। আর ইসলামী খিলাফতের মূল উদ্দেশ্য হল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে জনসেবা করা আল্লাহর নির্ধারিত বিধান অনুপাতে।

খ, গ-ইসলামের দৃষ্টিতে গণতন্ত্র

প্রচলিত গণতন্ত্রে রাষ্ট্র প্রধান নির্বাচনের পদ্ধতি মাত্র একটাই। সেটা হল সাধারণ নির্বাচন। পক্ষান্তরে ইসলামী খেলাফত পদ্ধতিতে রাষ্ট্র প্রধান নির্বাচনেরর পদ্ধতি বহুবিধ।
প্রচলিত গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের ছোট-বড়, যোগ্য-অযোগ্য, বুদ্ধিমান-নির্বোধ নির্বিশেষে সকলের রায় বা মতামত (ভোট) সমানভাবে মূল্যায়িত হয়ে থাকে। কিন্তু রাসূল সাঃ, খোলাফায়ে রাশেদা ও আদর্শ যুগের কর্মপন্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ইসলাম মতামত গ্রহণের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যথাযথ কর্তৃত্ব সম্পন্ন যোগ্য কর্তৃপক্ষ এর মতামতের মূল্যায়ন করে থাকে। ঢালাওভাবে সকলের মত গ্রহণ ও সকলের মতামতের সমান মূল্যায়ন দ্বারা সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছার বিষয়টি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কুরআনের একটি আয়াত এদিকে ইংগিত পাওয়া যায়। আয়াতটি হল-
وَإِن تُطِعْ أَكْثَرَ مَن فِي الأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ إِن يَتَّبِعُونَ إِلاَّ الظَّنَّ وَإِنْ هُمْ إِلاَّ يَخْرُصُونَ (116)
অর্থাৎ যদি তুমি পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের কথামত চল, তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দিবে। {সূরা আন’আম-১১৬}
প্রচলিত গণতন্ত্রে জনগণকে সকল ক্ষমতার উৎস মানা হয়। জনগণকে আইনের উৎস মানা ঈমান পরিপন্থী। কেননা, ইসলামী আক্বিদা বিশ্বাসে আল্লাহকেই সর্বময় ক্ষমতার উৎস স্বীকার করা হয়। কুরআনে পাকে ইরশাদ হয়েছে-
قُلْ مَن بِيَدِهِ مَلَكُوتُ كُلِّ شَيْءٍ
অর্থাৎ তুমি বল সমস্ত কিছুর কর্তৃত্ব [সর্বময় ক্ষমতা] কার হাতে? {সুরা মু’মিনুন-৮৮}
قُلِ اللَّهُمَّ مَالِكَ الْمُلْكِ تُؤْتِي الْمُلْكَ مَن تَشَاء وَتَنزِعُ الْمُلْكَ مِمَّن تَشَاء وَتُعِزُّ مَن تَشَاء وَتُذِلُّ مَن تَشَاء بِيَدِكَ الْخَيْرُ إِنَّكَ عَلَىَ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ (26)
অর্থাৎ তুমি বল-হে সর্বভৌম ক্ষমতার মালিক আল্লাহ! তুমি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা প্রদান কর, এবং যার নিকট থেকে ইচ্ছা ক্ষমতা কেড়ে নাও। যাকে ইচ্ছা সম্মান দান কর। যাকে ইচ্ছে পদদলিত কর। সব কিছুই তোমার হাতে। নিশ্চয় তুমি সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাবান। {সুরা আলে ইমরান-২৬}
إِنِ الْحُكْمُ إِلاَّ لِلّهِ
অর্থাৎ কর্তৃত্বতো আল্লাহরই। {সূরা আনআম-৫৭}
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ (44)
অর্থাৎ আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিধান দেয়না তারা হল কাফের। {সূরা মায়িদা-৪৪}
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أنزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ (45)
অর্থাৎ আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিধান দেয়না তারা হল জালেম। {সূরা মায়িদা-৪৫}
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ (47)
অর্থাৎ আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিধান দেয়না তারা হল ফাসেক। {সূরা মায়িদা-৪৪}
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُواْ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُواْ إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُواْ أَن يَكْفُرُواْ بِهِ وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُضِلَّهُمْ ضَلاَلاً بَعِيدًا (60)
অর্থাৎ তুমি তাদেরকে দেখনি যারা দাবি করে যে, তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে এবং তোমার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে তাতে তারা ঈমান এনেছে, অথচ তারা তাগুতের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে চায়, যদিও তাদেরকে তা প্রত্যাখ্যান করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে {সূরা নিসা-৪}
সুতরাং গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ইত্যাদীকে মুক্তির পথ মনে করা এবং একথা বলা যে, ইসলাম সেকেলে মতবাদ, এর দ্বারা বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের যুগে উন্নতি অগ্রগতি সম্ভব নয় এটা কুফরী। এসব প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা ফিকির করা জায়েজ নয়।

ঘ-গণতন্ত্র দ্বারা কি ইসলাম প্রতিষ্ঠা সম্ভব?

আল্লাহর দেয়া নির্ধারিত পথ খিলাফত প্রতিষ্ঠা ছাড়া মানুষের গড়া মতবাদ গণতন্ত্র দিয়ে কখনোই ইসলাম প্রতিষ্ঠা সম্ভব হতে পারে না।

ঙ. গনতন্ত্র এবং শুরা কি একই? পার্থক্য থাকলে তা কি?

ইসলামে শুরা কাকে বলে? শুরা হল-পরামর্শ করা। তথা কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমাধানের জন্য উক্ত বিষয়ে বিজ্ঞ ও পরহেযগার ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শ করে সীদ্ধান্ত গ্রহণকে বলা হয় শুরা পদ্ধতি। আর গণতন্ত্র হল জ্ঞানী-মুর্খ, বোকা-বুদ্ধিমান সকল প্রকার মানুষের মতকে গ্রহণ করে আধিক্যের উপর ফায়সালা করা। চাই বোকার দল বেশি হওয়ার কারণে সীদ্ধান্তটি ভুল হোক, বা সঠিক হোক।

পক্ষান্তরে শুরা পদ্ধতির মূল থিউরীই যেহেতু জ্ঞানী, গুনীদের পরামর্শক্রমে সীদ্ধান্ত গ্রহণ। সুতরাং শুরা পদ্ধতি ও গণতন্ত্রের মাঝে মৌলিক পার্থক্য হল-শুরা হল কেবল জ্ঞানীদের মতামতের উপর সীদ্ধান্ত গ্রহণ, আর গণতন্ত্র হল-জ্ঞানী-মুর্খ, বোকা-বুদ্ধিমান সকল প্রকার মানুষের মতামত আধিক্যতার ভিত্তিতে গ্রহণ।








৩টি মন্তব্য:

  1. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন
  2. আমরা যদি গণতন্ত্রকে বুঝতে চাই তবে যেহেতু গণতন্ত্র একটি রাজনৈতিক মতবাদ তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় অন্নান্য মতবাদগুলো সম্পর্কে কমবেশী ধারণা রাখা প্রয়োজন। উল্লেখিত আলোচনা থেকে এটা ষ্পষ্ট হয়ে উঠে যে খ্রীষ্টের প্রায় ৫০০ বছর পূর্বে যে গণতন্ত্রের সৃষ্টি তা কালক্রমে বিভিন্ন আকৃতি ও প্রকৃতি ধারন করে আজ একবিংশ শতাব্দিতে এসে ভিন্ন রূপে আমাদের সামনে উপস্থিত। শুধু কি গণতন্ত্রের এ অবস্থা ? না এর পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনার আরো নানা ধরণের মতবাদ যুগে যুগে প্রতিষ্ঠা পেয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহ্রত হয়েছে। আমরা জানি প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্র মতবাদ ও সাম্যবাদের কথা, এরিষ্টুটলের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র চিন্তার পরপরই শুরু হয় জেনো ক্রিসিপাসের রাষ্ট্র চিন্তায় ষ্টয়িকবাদের উত্থান। এর পর শুরু হয় মধ্যযুগের রাষ্ট্র চিন্তায় সম্রাজ্য ও চার্চের সমন্বয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার পথ পরিক্রমা। এক পর্যায়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় সম্রাজ্যের শাসক ও চার্চের পোপের মধ্যকার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে পোপ হয়ে উঠেন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। যিশুর বিধান মানব হাতে পরিবর্তিত হয়ে যখন তা পোপের ইচ্ছা –অনিচ্ছার রূপ পরিগ্রহ করে রাষ্ট্রের আইনে পরিণত হলো তখন রাষ্ট্রের নাগরিক গণ ধর্ম থেকে রাষ্ট্রকে আবার আলাদা করে দেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করল। এরই মধ্যে ইশ্বরের স্বর্গ রাজ্য রোমের পতনে রাষ্ট্রের নাগরিক গণ রাষ্ট্রের ব্যপারে দেবতাদের অবজ্ঞার প্রজ্ঞাপন জারি করলে সেন্ট অগাষ্টিন রাষ্ট্র চিন্তায় নতুন মতবাদ যোগ করে স্বর্গরাজ্য ও পার্থিব রাজ্যের ধারণা সৃষ্টি করে ধর্ম ও রাষ্ট্রকে সসম্মানে আগের জায়গায় ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্ট করেন। সেন্ট টমাস এক্যুনাস এ ধারণাকে আরো শক্তিশালি ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। কিন্তু মার্সিলিও এসে রাষ্ট্র ও ধর্মের মধ্যকার যুগসূত্র একেবারেই অস্বীকার করেন। ধর্মের প্রতি তার এলার্জিটিক মনোভাবের কারণে সম্ভবত ধর্মের যাবতীয় বিধিবিধান যা রাষ্ট্রের উপর অনেক সময় প্রভাব বিস্তার করত তাকে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে তিনি অস্বীকার করে বসেন। পুরোপুরি তিনি ধর্মকে রাষ্ট্রের আজ্ঞাবহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসার মত প্রকাশ করেন। এমনকি ধর্মীয় অপরাধের পার্থিব কোন বিচার ধর্মগুরুগণ করতে পারবে না বলে মত দেন। এভাবে ধর্ম হয়ে যায় যার যার ব্যক্তিগত বিষয় আর রাষ্ট্র হয়ে উঠে জনগণের নিয়ন্ত্রনকারী ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। এর পর ঘটতে থাকে প্লেটোর সাম্যবাদের বিবর্তণের রূপ পরিগ্রহ করে সমাজতন্ত্রের আগমন। রাষ্ট্র পরিচালনার এ রকম নানাবিধ মতবাদ মানুষের কল্যাণের জন্যই প্রতিষ্টিত করার প্রানপন চেষ্টা চলেছে যুগের পর যুগ।
    এভাবে যদি রাষ্ট্র পরিচালনার বর্তমান থেকে অতীতের দিকে যাত্রা শুরু করি তবে খ্রীষ্টের জন্মের প্রায় ৫০০ বছর পূর্ব পর্যন্ত রাষ্ট্রপরিচালনায় ইতিহাসের পাতা পরিভ্রমন করা সম্ভব হয়। প্রায় আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস। এ ইতিহাসের বাইরে গিয়ে রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের আকার-আকৃতি, স্বরূপ , আইন, শাসন প্রকৃতি, ক্ষমতা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করার খুব একটা সুযোগ নেই। এ সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন রাষ্ট্রের উৎপত্তি

    উত্তরমুছুন
  3. রাষ্ট্রের চিন্তায় জন্ম হয়েছে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে তারা উৎভাবন করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক মতবাদ। সময়ের প্রয়োজনে এ সকল রাজনৈতিক মতবাদ রাষ্ট্র পরিচালকগণ রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছেন। আবার প্রতিটি মতবাদই বারবার পরিবর্তিত হয়ে ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। এমনকি প্রতিটি মতবাদ অন্য এক বা একাধিক মতবাদের ধারক ও বাহকদের দ্বারা যুক্তিভিত্তিক অথবা অযৌক্তিক উপাখ্যানে সমালোচিত হয়েছে। পর্যালোচনা করলে দেখা যায় প্রতিটি রাজনৈতিক মতবাদ নীতির কথা বলেছে অথচ নৈতিক ভিত্তির উপর দাড়িয়ে নৈতিকতার সংজ্ঞা নিরূপন করতে ব্যর্থ হয়েছে। বলা যায় প্লেটো সাম্যবাদের কথা বলেছেন অথচ রাষ্ট্রের প্রয়োজনে দাসপ্রথার পক্ষে ছিলেন। এবং সাম্যবাদের নাম করে যৌনতাকে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিয়ে নৈতিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্টিত পরিবার প্রথাকে ভেঙ্গে দিতে চেয়েছেন। এরিস্টুটল গণতন্ত্রের কথা বলেছেন অথচ দাসদেরকে রাষ্ট্রের অজৈব যন্ত্রের সাথে তুলনা করে সমগ্র মানবতাকে অপমান করেছেন। ষ্টয়িকবাদে জেনো, ক্রিসিপাস যে ধারণা পেশ করেছেন তা স্রষ্টার ক্ষমতাকে স্বীকার করার কারণে অনেকটা মানবিক আচরণে সমৃদ্ধ কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যে রকম স্বর্গীয় বিধি-বিধান প্রয়োজন ছিল তা তাদের কাছে দৃশ্যমান না থাকায় এ মতবাদের নৈতিক ভিত্তি মজবুত থাকলেও তা রাষ্ট্র পরিচালনায় বেশি দূর এগুতে পারনি। তাছাড়া মধ্য যুগে চার্চঃকে রাষ্ট্রের কাছে টেনে এনে বিকৃত ঐশ্বরিক প্রজ্ঞাপনে রাষ্ট্র পরিচালনায় রাষ্ট্রের নাগরিকগণ যে ধাক্কা খেলো তাতে পরবর্তীকালে মার্সিলিওদের মত ধর্মের প্রতি এলার্জিটিক মনোভাবাপন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের সমালোচনার মধ্য দিয়ে এজাতীয় মতবাদ ঐশ্বরিক মতবাদ নামে ইতিহাসের পাতায় কর্মহীন হয়ে পড়ে আছে। এ সকল রাজনৈতিক মতবাদের পাশাপাশি কালমার্কস, লেনিন, মাউসেতুং প্রমূখ রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় মনোনিবেশ করে এবং অতি প্রাকৃতিক আইনকে অস্বীকার করার মাধ্যমে স্রষ্টার অস্তিত্বকেই অস্বীকার করেন। হেগেলের ঐতিহাসিক দর্শন ও ডারউইনের ক্রমবিকাশবাদকে কাল মার্কস তার বস্তুবাদী ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা দ্বারা রাষ্ট্রের ভীত রচনা করে একেবারে রাষ্ট্র পরিচালনায় বাস্তব নমুনা পেশ করে দেখিয়ে দিলেন। এভাবেই চলছে রাষ্ট্র পরিচানায় নতুন নতুন মতবাদের প্রয়োগ।

    উত্তরমুছুন